
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সবকিছুর দামই বেড়েছে। কিন্তু তেলের ব্যবহার কমেনি। এমনকি তেলবাজিও কমেনি। তেলবাজিটা এখন রাজনীতির ময়দানেও জেঁকে বসেছে। আমাদের নেতা-নেত্রীদের চারপাশে পঙ্গপালের মতো ভক্তকুল ঘুর ঘুর করে। একদণ্ডও তাদের একা হতে দেয় না। তাদের শয়নে-স্বপনে-জাগরণে চারদিকে ভক্ত-অনুসারীদের ভিড়।
এই অনুসারীদের মধ্যে কে কার চেয়ে বড় ভক্ত, কে নেতা বা নেত্রীর সবচেয়ে কাছের, সেটা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। যাদেরকে দলের দুঃসময়ে রাজপথে দেখা যায়নি তারাই এখন বড় তেলবাজ,কারণ প্রত্যেক অনুসারীই নেতা বা নেত্রীর জন্য জান-কোরবান করতে সারাক্ষণ প্রস্তুত। প্রকৃত বিপদের সময় নেতা বা নেত্রীর জন্য কয়জন জান দেবেন এটাই প্রশ্ন?
লোক-দেখানো ভক্তি, আড়ম্বর, প্রেম- এসবকে সহজে বোঝানোর জন্য সংক্ষিপ্ত শব্দ তেলবাজি বা তৈলমর্দন। বর্তমানে তা একচেটিয়া চলছে। একসময় কানু বিনে কোনো গীত হতো না। সব গানেই থাকত কানু বা কৃষ্ণ-প্রসঙ্গ। এখন রাজনীতিতে তেলবাজি ছাড়া আর কোনো চর্চা নেই। অবশ্য তেলবাজি আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই দোর্দণ্ড প্রতাপে বিরাজ করছে।
সুতরাং তেলবাজি নতুন কিছু নয়, প্রাচীন আমল থেকেই চলছে। সেই অবিভক্ত ভারতবর্ষ থেকে শুরু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পর্যন্ত যত সরকার এসেছে সবাই তেলবাজি করেছে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো নেতাও গোলাম মোহাম্মদের মতো আমলাকে বরণের জন্য মালা হাতে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজনীতি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত থেকে আমলাতন্ত্র– তেলবাজি ছিল, আছে, হয়তো থাকবেও।
তৈলশিল্প অদ্ভুত দারুণ এক শিল্প, পৃথিবীর সব ধরনের শিল্প এর কাছে তুচ্ছ। কোনো এক অখ্যাত ব্যক্তি বলেছেন, ‘তেলবাজিতে ওস্তাদ যারা আকাশে উড়াল দেয় তারা’। কারণ ঘর থেকে বাহির- পুরো দুনিয়া এখন চলে তেলে। যত বেশি দেবেন তেল, ততই আপনার বাড়বে বেইল- এমন থিওরিতে এখন পুরো দুনিয়া চলে।
আমাদের সমাজ থেকে সৎ-ভাবনা, সৎ-চিন্তা, সৎ-কর্ম, বিনয়, ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, সৌজন্য, প্রশংসা- ইত্যাদি শোভন আচরণগুলো একেবারেই উঠে গেছে। এখন কেউ কারও ভালো কাজের প্রশংসা যত না করে, তার চেয়ে বেশি করে তেলবাজি। সত্যিকার অর্থে কারও ভূমিকার জন্য এখন আর কেউ তেমন প্রশংসা করে না। হয় নিন্দা করে। অথবা তেলবাজিতে ভাসিয়ে দেয়।
আমাদের দেশে যে যত বেশি ক্ষমতাবান, তাকে ঘিরে তেলবাজি হয় তত বেশি। তেল মারার এই চর্চাটি দলনির্বিশেষে চলছে। দলনেত্রীর তোষামোদে বড় বা ছোট দলে, স্থানীয় বা কেন্দ্র স্তরে, শাসক বা বিরোধী দলে তেমন কোনো প্রভেদ নেই। এই প্রবণতা ভূগোলনিরপেক্ষও, দেশের উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম তফাত নেই,
বর্তমানে রাজনীতিতে যে যত তেল মারতে পারবেন, সে মূল নেতার তত কাছে আসতে পারবেন। কিন্তু যারা দলের দুঃসময়ে হামলা মামলা জেল জুলুমের শিকার হয়েছে সেই ত্যাগীরা তেল মারার মতো এত বড় ‘মহৎ’ কাজটি কখনো করতে পারেন না। তাই তো তাদের এখন সামনের সারিতে দেখা যায় না, দেখা যায় একদম পেছনে। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মাঠ এত তৈলাক্ত হয়ে পড়েছে যে, যে কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি। আগে কোনো নেতার সঙ্গে দেখা হলে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যেত আবেগে। কাছে পেলে পায়ে ধরে সালাম করতে ইচ্ছে করত। আর না হলে বুকে বুক লাগিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করত। আর সেটাও ছিল খুব সহজ। কিন্তু এখন কোনো বড় নেতার সঙ্গে দেখা করতে হলে নেতার চামচাদের আগে তেল মারতে হয়। কয়েক দিন পেছনে পেছনে ঘুরে, সন্তুষ্ট করতে পারলে তবেই সেই নেতার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আমাদের বর্তমান রাজনীতি পুরোটাই ‘তৈলাক্ত’ হয়ে পড়েছে। এখানে তেল ছাড়া কাজ হয় না। আবার অতিরিক্ত তেলের কারণে চলাফেরাও করতে হয় অত্যন্ত সাবধানে। এই ‘তৈলাক্ত’ রাজনীতির কারণেই অনেক আদর্শবান নেতা-কর্মী দূরে সরে যাচ্ছেন। তেলবাজদের কারণে নেতা-নেত্রীরা এখন প্রকৃত তথ্য জানতে বা শুনতে পারেন না। যা শুনলে তারা খুশি হন, এমন তথ্যই তাদের শোনানো হয়।
প্রশ্ন হলো, তেলবাজির কারণে ‘তৈলাক্ত’ ও অতিতেল ব্যবহারের কারণে ‘পিচ্ছিল’ হয়ে পড়া সেই ত্যাগী মানুষগুলোকে উঠাবে কে?
ইয়াছিন আরাফাত
সম্পাদক ও প্রকাশক
সময়ের খবর






















আপনার মতামত লিখুন :